
Description
মানুষের জীবন নশ্বর, সময়ের সঙ্গে বদলে যায় তার ঠিকানা, পেশা, পরিচিত পৃথিবী। কিন্তু কিছু সম্পর্ক এমন থাকে, যা সময় ও মৃত্যুর সীমাকেও অতিক্রম করে। পিতা ও পুত্রের সেই গভীর, স্বতঃস্ফূর্ত এবং অকৃত্রিম ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশ্বর। উপন্যাসের শুরু রামলালকে ঘিরে—জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যাঁর সামনে বদলে যাচ্ছে পরিচিত পৃথিবী। সরকারি চাকরির নিয়ম, বয়সের সীমা এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। নিজের ছেলে শ্যামলালের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর চিন্তা। জীবিকার সন্ধানে পিতা-পুত্র পাড়ি জমায় পরিচিত বাংলার বাইরে, নতুন এক ভূখণ্ডের উদ্দেশে। অচেনা পরিবেশ, নতুন সম্ভাবনা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে তাদের পথচলা ধীরে ধীরে গল্পটিকে বৃহত্তর মানবজীবনের এক প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করে। অনশ্বর-এর বিশেষ আকর্ষণ তার পিতা-পুত্রের সম্পর্কের উষ্ণতায়। এখানে ভালোবাসা কোনো বড় বড় ঘোষণায় প্রকাশিত হয় না; বরং দায়িত্ব, উদ্বেগ, সঙ্গ, নির্ভরতা এবং জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্য দিয়েই তা গভীর হয়ে ওঠে। জীবিকার তাগিদে মানুষ যখন নিজের পরিচিত শিকড় ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ায়, তখন তার সঙ্গে যাত্রা করে স্মৃতি, সম্পর্ক এবং আপনজনের প্রতি টান। এই উপন্যাসে ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সময়ের সামাজিক বাস্তবতারও ছাপ রয়েছে। দেশভাগ-পরবর্তী উদ্বাস্তু জীবন, অন্নের সন্ধানে মানুষের স্থানান্তর এবং নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম কাহিনির পটভূমিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যেও যে স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা টিকে থাকে, অনশ্বর মূলত সেই চিরন্তন মানবিক সত্যের কথাই বলে। বিভূতিভূষণ এই উপন্যাসটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। তাঁর রচিত অংশের পরবর্তী অধ্যায় অন্য লেখকদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়েছে। ফলে অনশ্বর-এর অসমাপ্ততার মধ্যেও এক বিশেষ আবেগ রয়েছে—যেন লেখকের কলম থেমে গেলেও গল্পের মানুষগুলো এবং তাদের সম্পর্ক পাঠকের মনে চলতেই থাকে। অনশ্বর তাই শুধু একটি অসমাপ্ত উপন্যাস নয়; এটি মানুষের নশ্বর জীবনের মধ্যে ভালোবাসার অনন্ত অস্তিত্বের এক মর্মস্পর্শী স্মারক। মানুষ চলে যায়, সময় বদলে যায়—কিন্তু সত্যিকারের স্নেহ কখনো শেষ হয় না। সেই ভালোবাসাই অনশ্বর।
Ratings & Reviews
No reviews yet.
Log in to leave a review.