
Description
জীবনের অন্ধকার সময়ে মানুষ কীভাবে নিজের ভেতরেই আলো খুঁজে পায়—মানুষের সেই অন্তর্গত যাত্রা, দুঃখ, সংগ্রাম এবং আত্মঅনুসন্ধানের এক গভীর কাহিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি প্রদীপ। উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে জিতু—এক সংবেদনশীল, কৌতূহলী এবং চিন্তাশীল কিশোর, যার জীবনের শুরুটা দার্জিলিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ পরিবেশে। কিন্তু পারিবারিক জীবনে হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। জিতুর বাবার চাকরি চলে যাওয়ার পর পরিবারকে ফিরে আসতে হয় তাদের পূর্বপুরুষের গ্রামে। সেখানে তারা যে আশ্রয় ও নিরাপত্তা খুঁজে পাবে বলে আশা করেছিল, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। নিজেদের বাড়ি ও জমিজমার ওপরও তারা আর আগের অধিকার ফিরে পায় না; আত্মীয়তার সম্পর্কের আড়ালে প্রকাশ পায় স্বার্থ, অন্যায় এবং ক্ষমতার নির্মম রূপ। অভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হতে থাকা জিতু খুব কাছ থেকে দেখতে থাকে মানুষের জীবনের নানা বৈপরীত্য। একদিকে রয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও অন্যায়; অন্যদিকে রয়েছে স্নেহ, ভালোবাসা, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের অন্তর্গত মহত্ত্ব। পরিবারের একের পর এক দুর্দশা তার কিশোর মনকে যেমন আঘাত করে, তেমনি তাকে জীবন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। জিতুর জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো ধীরে ধীরে তাকে শুধু একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখে না; সে নিজের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং জগতের অন্তর্নিহিত সত্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে। বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তার মনে জন্ম নেয় এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান। সেই কারণেই দৃষ্টি প্রদীপ শুধু একটি পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার গল্প নয়; এটি একজন মানুষের মানসিক ও আত্মিক পরিণতির কাহিনিও। বিভূতিভূষণের স্বভাবসিদ্ধ মমতা, প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুভব এবং মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে জিতুর ব্যক্তিগত জীবন ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বৃহত্তর মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি। দুঃখ তাকে ভেঙে দেয়, আবার সেই দুঃখই তাকে জীবনের গভীরতর অর্থের দিকে তাকাতে শেখায়। দৃষ্টি প্রদীপ তাই অন্ধকারের গল্প হয়েও শেষ পর্যন্ত আলোর সন্ধানের গল্প—যে আলো বাইরে নয়, মানুষের নিজের দৃষ্টির মধ্যেই ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে। জীবনের অন্ধকার যত গভীর হয়, সত্যকে দেখার আলো ততই নিজের ভেতর থেকে জ্বলে উঠতে শুরু করে।
Ratings & Reviews
No reviews yet.
Log in to leave a review.